দুই দশকের যুদ্ধের পর আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান বাহিনী তাদের দেশে ফিরে আসে। এর মাধ্যমে চীনের জন্য দরজা খুলে গেল যা যুক্তরাষ্ট্রের কারণে বন্ধ ছিল। নিজের প্রভাব বাড়াতে এবং দেশে মূল্যবান খনিজ সম্পদের সন্ধানে চীন এখানে সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু এক বছর পার হলেও এ দিকে কোনও অগ্রগতি হয়নি। আফগানিস্তানের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, ১৯ মিলিয়ন মানুষ ক্ষিদেয় জর্জরিত এবং তালেবানদের চীন থেকে যে বিনিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল তা এখনও আসেনি। চীন ও তালেবান এখন এই পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দায়ী করছে।
আফগানিস্তানের চেম্বার অফ কমার্সের ভাইস-প্রেসিডেন্ট খান জান অ্যালোকোজে বলেছেন যে, চীন থেকে বিনিয়োগের জন্য এখনও একটি পয়সাও পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, অনেক কোম্পানি এসে দেখা করে, গবেষণা করে কিন্তু তারপর থেকে তারা উধাও। তিনি বলেন, এটা সত্যিই হতাশাজনক। অন্যদিকে, চীন বলেছে যে, তালেবান পক্ষ পশ্চিম জিনজিয়াংয়ে উপস্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে যোগাযোগকারী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি।
যদি চীন সরকারের সূত্রের কথা বিশ্বাস করা হয়, তালেবানরা আফগানিস্তানে উপস্থিত সম্পদ সম্পর্কিত প্রকল্প নিয়ে চীনের সাথে পুনরায় আলোচনা করতে চায়। তালেবানের পক্ষ থেকে অনেকবার বলা হয়েছে যে, তারা আফগান মাটি থেকে কোনও সন্ত্রাসী সংগঠনকে কাজ করতে দেবে না। চীন বহুবার বলেছে যে, তালেবানদের ইস্ট তুরস্ক ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম) এর উপর কাজ করা উচিৎ। চীন এটিকে একটি মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বলে মনে করে, যারা জিনজিয়াংয়ে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। চীন এবং আফগানিস্তান উভয়েরই জিনজিয়াং অঞ্চলে ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে।
তালেবানের পক্ষ থেকে বহুবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যে, ইটিআইএম আফগানিস্তান থেকে সঞ্চালিত হচ্ছে না। পাশাপাশি, আফগানিস্তানের মাটি থেকে কোনও দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র হতে দেওয়া হবে না। দোহায় সিনিয়র তালেবান নেতা সুহেল শাহীন একথা জানিয়েছেন। কিন্তু এই বছরের মে মাসে জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে বেশ কয়েকটি দেশের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ইটিআইএম আফগানিস্তানে রয়েছে। জিনজিয়াং-এর কোনও সংস্থাকে সমর্থন, চীন পছন্দ করে না।
আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশগুলি প্রায়ই এই অঞ্চলের উইঘুর মুসলমানদের ওপর নৃশংসতার জন্য চীনকে অভিযুক্ত করেছে। যেখানে চীন সর্বদা এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এটিকে তার অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে। আফগানিস্তানে বিদ্যমান খনিজগুলো বহু শতাব্দী প্রাচীন। আমেরিকা চলে যাওয়ার পর, চীন ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, তারা এই সম্পদগুলি অর্জন করেই ছাড়বে। কিছু যৌথ উদ্যোগও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু এখন নতুন প্রকল্প আটকে আছে। তালেবানের কারণে বিশ্বের সব দেশ আফগানিস্তানে সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছিল, চীনই একমাত্র দেশ, যে নতুন সরকারকে আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সামরিক কৌশলবিদ এবং প্রাক্তন কর্নেল ঝৌ বো-এর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ছেড়ে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করতে চীন প্রস্তুত। তিনি নিউইয়র্ক টাইমস-এ লিখেছেন যে, আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ কোনও গুপ্তধনের চেয়ে কম নয় এবং তালেবানদের সাথে সম্পর্ক প্রধান সুবিধা হতে চলেছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ওয়াই তালেবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন।
তিনি চলতি বছরের মার্চে কাবুলে গিয়েছিলেন এবং এটি একটি অসাধারণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এখানেই তিনি ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে দেখা করেন। ওয়াং, দেশটির নেতাদের প্রশংসা করেন এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রোগ্রামে আফগানিস্তানের অংশীদারিত্বের দিকে ইঙ্গিত করেন। এখন পর্যন্ত চীন তালেবানদের সম্পদের জন্য যে দাবী করেছে, তাতে কোনও মনোযোগ দেয়নি।

No comments:
Post a Comment