শূন্যে গুলি চালিয়ে পুজোর সূচনা হয় আজও! রায় জমিদার বাড়ির এটাই রীতি
মালদা: শূন্যে পাঁচ রাউন্ড গুলি চালিয়ে সূচনা করা হয় মায়ের পুজোর। রীতি-ঐতিহ্য মেনে আজও হয়ে আসছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের রায় জমিদার বাড়ির দুর্গা পুজোর। ২২৩ বছর ধরে মালদা জেলার পূর্বপ্রান্তে হবিবপুর থানার সিঙ্গাবাদ তিলাসন এলাকায় সিঙ্গাবাদ জমিদার বাড়িতে হয়ে আসছে এই পুজো।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের ফলে এই জমিদারী স্টেটের সিংহভাগ অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশের অংশে পড়লেও আজও ভারতীয় ভূখণ্ডে সীমান্তের কাঁটাতার থেকে ৫০ মিটার দূরত্বে অবস্থিত বিশাল রায় জমিদার বাড়ি। সময়ের সাথে চলে গিয়েছে জমিদারি। সুবিশাল বাড়ির বিভিন্ন অংশ জুড়ে ধরেছে ফাটল। কিন্তু এখনও অক্ষুন্ন রয়েছে ঐতিহ্য।
সুদুর উত্তরপ্রদেশ থেকে ডাল ব্যবসা করতে বাংলায় এসেছিলেন অবোধ নারায়ণ রায়। মালদা জেলার হবিবপুর থানার সিঙ্গাবাদ স্টেশনে ট্রেনে করে এই ডাল নিয়ে আসেন তিনি। এরপর নৌকাপথে সেই ডাল ঢাকা রাজশাহী সহ কলকাতার খিদিরপুর বন্দরে বিক্রির উদ্দেশ্যে যেত। ব্যবসার সুবিধার জন্য এই এলাকায় ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে তৎকালীন প্রায় তিন হাজার টাকায় জমিদারীত্ব ক্রয় করেন তিনি। এরপর এই এলাকায় শুরু করেন বসবাস। পরবর্তীতে তিনজন সাধুর পরামর্শে দেবী দূর্গার আরাধনা শুরু করেন। ২২৩ বছর ধরে এই পুজো হয়ে আসছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জমিদারির সিংহভাগ অংশ চলে যায় সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে অর্থাৎ বাংলাদেশে , বাকি অংশ রয়ে যায় ভারতবর্ষে। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই রায় জমদার বাড়ির পুজো বেশ জনপ্রিয়। হাজার হাজার মানুষ এই পুজোতে অংশগ্রহণ করেন। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সীমান্তের ওপার থেকে মানুষ আসতেন এই পুজো দেখতে। কিন্তু বর্তমানে সেই রকম পরিস্থিতি নেই; তবে রয়ে গেছে ঐতিহ্য। রয়েছে ইতিহাস।
প্রাচীন এই জমিদার বাড়ির দেওয়ালে ফাটল ধরলেও এখনও দেওয়ালে রয়েছে বিশাল কুমিরের ছাল, যা তারই পূর্বপুরুষরা শিকার করেছিলেন। এখনও এই পুজো উপলক্ষে চারদিন থাকে পাত পেড়ে খাওয়ার ব্যবস্থা। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সীমান্তবর্তী এই গ্রামের পুজোতে অংশগ্রহণ করতে আসেন মানুষ।
এই জমিদার স্টেটের বংশধর রাকেশ কুমার রায় জানান, এই বছরও চিরাচরিত প্রথা এনে সপ্তমীর দিন পুণর্ভবা নদী থেকে পুজোর জন্য জল নিয়ে আসা হবে। সেই সময় পাঁচ রাউন্ড শূন্যে গুলি চালিয়ে এই পুজোর সূচনা হয় এই বছরও তা হবে। এই পুজোতে ভোগ রান্না থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু করেন উত্তরপ্রদেশের মৈথিল ব্রাহ্মণরা। দশমীর দিন এই তিলাসন গ্রামের পাশে পূর্ণভবা নদীতেই প্রতিমা বিসর্জন করা হয়।
রায় জমিদার পরিবারের বংশধর রাকেশ কুমার রায় আরও জানান, তাঁর পূর্বপুরুষের ইতিহাসের অনেক সাক্ষী এই পুজো আজও সমাদরে পালিত হয়ে আসছে।

No comments:
Post a Comment