কাঁটাতার ডিঙিয়ে আসা হিন্দু-মুসলমান সবাইকে ওপারে যেতে হবে: শুভেন্দু অধিকারী
নিজস্ব সংবাদদাতা, ২৯ মে, কলকাতা: 'হিন্দু হোক বা মুসলিম! কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে যারা ঢুকেছো, তাদের কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে যেতে হবে', এমনই মন্তব্য করলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার মালদার মানিকচকের একটি জনসভা থেকে এই মন্তব্য করেন শুভেন্দু অধিকারী।
রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে যেমন নিশানা করেন, তেমন এত দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও যারা এই দলটিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে তাদের বিরুদ্ধেও তোপ দাগেন শুভেন্দু।
সভায় উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের বিষয়টি উত্থাপন করে শুভেন্দু বলেন, "প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সমস্ত উন্নয়ন করেছেন। আমি সংখ্যালঘুদের বলব আট জন সংসারে আছেন, গম আর চাল মিলিয়ে আপনারা ৪০ কিলোগ্রাম করে রেসনের মালামাল নিয়ে আসছেন। এটা আপনার দিদি বা পিসির টাকা নয়। এটা ভারত সরকারের অর্থ। ২০২১ সালের মে মাস থেকে ৮১ কোটি মানুষকে 'অন্ন সুরক্ষা যোজনা'তে বছরে দুই লক্ষ কোটি খরচ করে প্রধানমন্ত্রী তাদের জন্য আহারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। তখন তো আপনাদের ভেদাভেদের কথা মনে পড়ে না। কেন এই চোর পার্টিকে (তৃণমূল) ভোট দেবেন? কেন আমাদের (বিজেপি) সাথে আসবেন না?। আমরা রাষ্ট্রবাদীদের সাথে আছি।"
এ সময় শুভেন্দুর হুঁশিয়ারি, 'যে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ঢুকেছো, তাকে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে যেতে হবে। সে হিন্দু হোক বা মুসলমান। কাঁটা তারের বেড়া ডিঙিয়ে এলেন তার সাথে কোনও ব্যাপার নেই। যে ভারতে জন্মেছন, যে রাষ্ট্রবাদকে বিশ্বাস করেন, জনগণমন-অধিনায়ক, বন্দেমাতারম বলেন, তার সাথে বিজেপির বিরোধ ছিল না, আজকেও নেই, কালকেও থাকবে না।"
তৃণমূলের বিরুদ্ধে শুভেন্দুর অভিযোগ, এনআরসির ভয় দেখিয়ে তারা ভোট নিয়েছে, আর সংখ্যালঘুরাও দলবেঁধে ভোট দিয়েছে। তাঁর অভিমত "ভারতে যারা জন্মেছেন, ভারতে যারা ঘুমোতে চান, তাদের সঙ্গে বিজেপির কোন বিরোধ নেই। নরেন্দ্র মোদীর একটা স্কিম শুধুমাত্র হিন্দু, আদিবাসী, জনজাতি বা তফসিলিদের জন্য নয়, সকলের জন্য।"
বছর ঘুরলেই ২০২৪ সালে ফের লোকসভার ভোট। তার আগে শুভেন্দুর এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
গত ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পরেই ওই বছরের ডিসেম্বরে সংসদে পাশ হয় সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)। ওই আইনে বলা হয়েছে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে আসা অমুসলিম নাগরিকদের (হিন্দু শিখ খ্রিস্টান, জৈন, পার্সি, বৌদ্ধ) ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। যদিও ওই আইনের বিরোধিতা করে সেসময় প্রতিবাদে নামে কংগ্রেস, তৃণমূল সহ বিরোধী দলগুলি। তাদের দাবী ধর্মের ভিত্তিতে এই আইন কোনভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সেক্ষেত্রে বিজেপির অভিমত ছিল মুসলমানরা ওই দেশগুলিতে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আসে না, স্বাভাবিকভাবেই তারা 'অনুপ্রবেশকারী'। অন্যদিকে হিন্দুদের 'শরণার্থী' হিসাবে আখ্যায়িত করেছিল তারা।
কিন্তু চার বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও এই আইনের বিধি নিয়ম (Rule Frame) জারি হয়নি, ফলে এই নতুন আইন বাস্তবে কার্যকর করা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ'-র যুক্তি ছিল করোনার কারণেই এই আইনের রূপায়ণ শুরু করা যাচ্ছে না। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক।
গত এপ্রিল মাসেই দুদিনের রাজ্য সফরে এলেও সিএএ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি অমিত শাহ। এমন অবস্থায় সিএএ ইস্যুতে শুভেন্দুর এই মন্তব্যে কিছুটা অস্বস্তিতে বিজেপি। যদিও ইতিমধ্যেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার জানিয়েছেন, এটি শুভেন্দুর ব্যক্তিগত অভিমত। এটা দলের অবস্থান নয়। বিজেপি কাউকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চায় না।
এদিনের সভা থেকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তুষ্টিকরণের রাজনীতির অভিযোগ তুলে শুভেন্দু বলেন, "প্রতিটা জায়গায়, প্রতিটা ক্ষেত্রে তৃণমূল রাজ্যকে ধ্বংসের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভাগ্যিস আমাদের ভারতের সাথে যুক্ত করে রেখে দিয়ে গিয়েছিলেন, না হলে আজ আমরা বাংলাদেশে থাকতাম, কিংবা অধুনা পাকিস্তানেই থাকতে হতো।"
'তৃণমূল'কে এখন 'বোমামূলে'র সাথে তুলনা করে শুভেন্দুর কটাক্ষ 'চারিদিকে বোবা বিস্ফোরণে মৃত্যু হচ্ছে। বাজি কারখানায় মানুষ মৃত্যু হচ্ছে। আসলে নির্বাচন আসছে তাই তোলামুলকে এখন চুরির লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। তোলামূল এখন বোমামূল হয়েছে।' তাঁর দাবী 'তৃণমূলকে সরাতে হবে। চোরেদের সরাতে হবে।'

No comments:
Post a Comment