কৈলাস নয়, জয়পুর রাজবাড়িতে দেবী দুর্গা আসেন ব্যাঙ্কের লকার থেকে!
পুরুলিয়া: সারা বছরের অপেক্ষার বাকি আর কিছু দিন। এরপরেই কৈলাস থেকে স্বপরিবারে মর্ত্যে আসবেন মা দুর্গা। কিন্তু পুরুলিয়ার জয়পুর রাজবাড়ির মা দুর্গা কৈলাসে নয়, তিনি থাকেন ব্যাঙ্কের লকারে। কড়া পুলিশি প্রহরায় ব্যাঙ্ক থেকে পুজো নিতে রাজবাড়িতে আসেন মা। পুজোর চার দিন শেষে আবারও পুলিশি ঘেরাটোপে ব্যাঙ্কে ফিরে যান মা।
জয়পুর রাজবাড়িতে রাজাও নেই, রাজত্ব নেই, আছে শুধু রাজার তৈরি দেড় কেজি সোনার মা দুর্গা। কিন্তু মা রাজবাড়িতে থাকেন না, থাকেন ব্যাঙ্কের লকারে। এর নেপথ্যে যদিও রয়েছে এক গুরুতর কারণ; ৬০-এর দশকে জয়পুর রাজবাড়িতে সোনার মা দুর্গার মূর্তি লুঠ করতে ডাকাত ঢুকে পড়ে। তখন থেকেই ব্যাঙ্কের লকারে রাখা হয় মা দুর্গাকে। ষষ্ঠীর দিন পুরুলিয়া সদর শহর থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় মা জয়পুর রাজবাড়িতে পুজো নেওয়ার জন্য উপস্থিত হন।
পুজোর চার দিন কড়া পুলিশি ঘেরাটোপে থেকে আবার ব্যাঙ্কের লকারেই ফিরে যান মা। এভাবেই জয়পুর রাজবাড়ির দুর্গা পুজো হয়ে আসছে বছরের পর বছর। বাংলা ঝাড়খন্ড সীমানা লাগোয়া পুরুলিয়া জেলা ছাড়িয়ে ভিন জেলা এবং ভিন রাজ্য থেকেও সোনার দুর্গা দেখতে প্রচুর দর্শনার্থী জয়পুর রাজবাড়িতে ভিড় জমান।
জয়পুর রাজবাড়ির পুজোর ইতিহাস সম্পর্কে কথিত আছে, প্রায় চারশো বছর আগে রাজা জয় সিংহ পুরুলিয়ায় আসেন, যাঁর নামে এই অঞ্চলের নাম জয়পুর৷ সেই সময় এই এলাকার মুণ্ডা সর্দারকে হত্যা করে জঙ্গলমহলের এই এলাকা দখল করেন তিনি। তারপর এই রাজবাড়িতে কলা বউয়ের পুজো শুরু করেন। এর বহু বছর কেটে যাওয়ার পর সপ্তম রাজা কাশীনাথ সিংহের আমলে দুর্গা পুজোর দিন ঘটে অঘটন, আগুন লেগে যায় কলা বউয়ে। এরপরই রাজা কাশিনাথ সিংহ মানত করেন, সোনার প্রতিমা তৈরি করে পুজো করার। প্রায় দেড় কেজি সোনা দিয়ে দুর্গা মূর্তি এবং রুপা দিয়ে চালচিত্র তৈরি করান রাজা৷ সোনার বিগ্রহ তৈরির জন্য বেনারসের স্বর্ণ শিল্পীদের ডাকা হয়। তৎকালীন সময়ের এক সের পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা তিনি শিল্পীদের দেন এবং তা দিয়ে সোনার দ্বিভূজা দুর্গা মূর্তি করা হয়। সেই থেকে সোনার মূর্তি পুজো হয়ে আসছে জয়পুর রাজবাড়িতে।
এরপর ১৯৬৮ সাল নাগাদ রাজবাড়িতে হানা দেয় ডাকাত দল। কিন্তু সোনার মূর্তির হদিশ না পেয়ে মন্দিরে রাখা সমস্ত অলঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায় তারা৷ এই ঘটনার পর তৎকালীন জেলা পুলিশের উদ্যোগে পুজোর চার দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে সোনার দুর্গা মূর্তি ব্যাঙ্কের লকারেই রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই রীতি চলে আসছে আজও।

No comments:
Post a Comment