অষ্টমীতে নিজেই নিজের ভোগ রাঁধেন দেবী! মায়ের রূপও এখানে বিশেষ
ঝাড়গ্রাম: দেবী এখানে সিংহবাহিনী নয়, তাঁর বাহন ঘোড়া। তিনি এখানে দশভূজাও নন, চতুর্ভূজা। তিনি পরিধান করেন নীল বস্ত্র। শুধু তাই নয়, প্রচলিত বিশ্বাস মতে, অষ্টমীর রাতে দেবী আজও নিজেই নিজের ভোগ রাঁধেন। এমনই পরতে পরতে নানান বিশ্বাস ছড়িয়ে রয়েছে ঝাড়গ্রাম জেলার চিল্কিগড়ের কনক দুর্গার কাহিনীর। ঝাড়গ্রাম জেলার চিল্কিগড়ের কনক দুর্গার মন্দির বাংলার পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও অন্যতম একটি নাম।
জামবনির সামন্ত রাজাদের প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরের ইতিহাস ৫০০ বছর পুরোনো। এলাকার স্থানীয় মানুষের কাছে খুবই জাগ্রত এই মন্দির। সারা বছরই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন পুজো দিতে। বাংলার প্রাচীন এই মন্দির ঘিরে রয়েছে নানান ঐতিহাসিক গল্প।
মন্দিরের পুরোহিত জানান, পুজোর চার দিন দেবী কনক দুর্গাকে বেশ কয়েক রকমের ভোগ নিবেদন করা হয়। দেবী র ভোগের নানান পদে থাকে হাঁসের ডিম, মাছ পোড়া, পাঠার মাংস, শাক ভাজা, পান্তা ভাত। এখানে সন্ধি পুজোরও বিশেষ গুরুত্ব আছে, ওই দিনই দেবী কনক দুর্গাকে দেওয়া হয় বিরাম ভোগ, যা দেবীর বিশেষ রান্না। শোনা যায়, এক সময় নরবলি হতো এই মন্দিরে এবং সেই রক্তেই পুজো হতো দেবী কনক দুর্গার। সেই বলির প্রথা আজও একই ভাবে চলছে, তবে এখন নরবলি নয়, প্রাচীন প্রথা মেনে মোষ বলি হয় এখানে।
অষ্টমীর পুজোর শেষে নিশি রাতে গভীর জঙ্গলে বলির আয়োজন করা হয়। বলির পরে সেই মাংসের সাথে জল ও অন্যান্য সামগ্রী মাটির হাঁড়িতে ঢেলে, শাল পাতা দিয়ে হাড়ির মুখ বেঁধে চিল্কিগর রাজবাড়ির একটি ঘরে উনানে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ওই উনানে তিনটি কাঠে আগুন জ্বেলে হাঁড়ির ওপরে হাতা-খুন্তি রেখে ঘরের দরজা তালা বন্ধ করে দেওয়া হয়। লোকমতে, এই রান্না দেবী নিজেই করেন। পরের দিন নবমী তিথির যজ্ঞের পরে সেই হাঁড়িতে রাখা মাংস মাকে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। পুরোহিত মতে এই ভোগকেই বলা হয় বিরাম ভোগ।
দশমীর ভোগে কনক দুর্গাকে দেওয়া হয় পান্তাভাতের সাথে শাক-ভাজা। সেই প্রাচীন কাল থেকে আজও একই ভাবে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। দুর্গা পুজোর সময় শুধু বাংলা নয়, পার্শ্ববর্তী রাজ্য উড়িষ্যা ও ঝাড়খণ্ড থেকেও বহু মানুষের সমাগম হয় দেবী কনক দুর্গার এই মন্দিরে।
উল্লেখ্য, প্রচলিত রয়েছে, জামবনির পরগনার সামন্তরাজা গোপীনাথ সিংহ মত্তগজ স্বপ্নাদেশ পেয়ে রানির হাতের কঙ্কণ দিয়ে দেবীর অষ্টধাতুর মূর্তি গড়িয়েছিল। কঙ্কণ দিয়ে তৈরি হয় বলেই দেবীর নামকরণ হয় কনক দুর্গা বলে। দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল গভীর জঙ্গলের মধ্যে ১৭৪৯ (১১৫৬ বঙ্গাব্দ) সালে আশ্বিন মাসের সপ্তমী তিথিতে।

No comments:
Post a Comment